ঢাকা ২৯শে এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ | ১৬ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
প্রকাশিত: ২:৪০ পূর্বাহ্ণ, এপ্রিল ২৯, ২০২৬
অনলাইন ডেস্ক:-যখন বিরোধিতার ঝড় উঠেছিল, তখন শেখ হাসিনা যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন — আজ তার ন্যায্যতা প্রমাণ করছে ইতিহাস
২০২৬ সালের ২৮ এপ্রিল। পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুরে একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত এলো নিঃশব্দে, কিন্তু সুগভীর তাৎপর্য নিয়ে। দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম চুল্লিতে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং শুরু হলো। বিশ্বের ৩৩তম পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অভিযাত্রা আনুষ্ঠানিকভাবে সূচিত হলো।
এই মাইলফলকে পৌঁছানো কেবল একটি প্রকৌশলগত সাফল্য নয় — এটি একটি রাজনৈতিক সাহসিকতার ফসল। কারণ এই প্রকল্পের পথচলা মোটেও সুগম ছিল না। শুরু থেকেই বিএনপি ও তার মিত্রদের বিরোধিতার ঝড় উঠেছিল চারদিক থেকে।
বিরোধিতার সেই দিনগুলো
বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা মোশাররফ হোসেন একদিন জোর গলায় বলেছিলেন, “রামপাল-রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্প দেশের স্বার্থবিরোধী।” আরেক স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খান বলেছিলেন, ঘনবসতিপূর্ণ বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন “অপরিণামদর্শিতার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ।”
অথচ সেই একই দলের অবৈধ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম স্বপন এখন স্বীকার করছেন — রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ২ কোটি মানুষের বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। রাজনীতির ভাষা যখন বাস্তবতার সামনে পিছু হটে, তখন সত্যটা আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
শেখ হাসিনার একটি স্বপ্নের শুরু
২০১০ সালে জাতীয় সংসদে প্রস্তাব পাস। ২০১১ সালে রাশিয়ার সাথে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষর। রোসাটোম স্টেট অ্যাটমিক এনার্জি কর্পোরেশনের কারিগরি সহায়তায় পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মার তীরে শুরু হয় ১ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্পের নির্মাণ — দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প।
দুটি ইউনিট, প্রতিটি ১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন। মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২,৪০০ মেগাওয়াট — যা বাংলাদেশের বর্তমান বিদ্যুৎ উৎপাদনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। করোনা মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের ধাক্কা পেরিয়ে আজ প্রকল্পটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে।
“জ্বালানি লোডিংয়ের পর তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হবে। প্রথমদিকেই অন্তত ৩০০ মেগাওয়াট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।”
— নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও রূপপুরের প্রাসঙ্গিকতা
২০২২ সালের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সারা বিশ্ব টের পেয়েছে জীবাশ্ম জ্বালানির উপর অতিনির্ভরশীলতা কতটা বিপজ্জনক। ইউরোপের দেশগুলো গ্যাসের দামের আগুনে পুড়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলো ডলার সংকটে জ্বালানি আমদানিতে হিমশিম খেয়েছে। বাংলাদেশও সেই আঁচ থেকে বাদ যায়নি।
ঠিক এই প্রেক্ষাপটেই রূপপুরের গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে যায়। পারমাণবিক বিদ্যুৎ একবার চালু হলে জ্বালানি আমদানির বিশাল চাপ থেকে মুক্তি মেলে, আন্তর্জাতিক বাজারের দামের ওঠানামার কাছে জিম্মি থাকতে হয় না। দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য এর চেয়ে উপযুক্ত বিনিয়োগ আর কী হতে পারে?
যারা বলেছিলেন ঘনবসতির দেশে পারমাণবিক কেন্দ্র চলে না — তারা হয়তো জানতেন না, ফ্রান্স তার বিদ্যুতের ৭০ শতাংশ পারমাণবিক উৎস থেকে পায়। দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান — সবই ঘনবসতিপূর্ণ, সবারই পারমাণবিক কেন্দ্র আছে। রূপপুরের VVER-1200 প্রযুক্তি তৃতীয় প্রজন্মের সর্বাধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাসম্পন্ন।
ইতিহাসের রায়
রাজনীতিতে বিরোধিতা স্বাভাবিক। কিন্তু যে বিরোধিতা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বার্থকে আড়াল করে, সেটি ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়ায়। রূপপুর নিয়ে যারা “অপরিণামদর্শিতা”র কথা বলেছিলেন, আজ বাস্তবতা তাদের সেই মন্তব্যকে জনগণের সামনে লজ্জার মুখোমুখি করেছে। অপরদিকে শেখ হাসিনার দূরদর্শিতা জনগণের কাছে প্রশংসার আসনে তাঁকে আরও উজ্জ্বল করে তুলছে।
আজ যখন রূপপুরের চুল্লিতে ইউরেনিয়ামের দানা একে একে প্রবেশ করছে — এটি কেবল একটি জ্বালানি প্রকল্পের মাইলফলক নয়। এটি শেখ হাসিনা সরকারের দূরদর্শী সিদ্ধান্তের ন্যায্যতার মুহূর্ত। এটি প্রমাণ করে — সাহসী সিদ্ধান্ত কখনও কখনও বিরোধিতার ঝড় পেরিয়ে ইতিহাসের আলোয় জ্বলে ওঠে।
লেখা: মফিজুল ইসলাম
গণমাধ্যম কর্মী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক :তানভীর হাসান।
ব্যাবস্থাপনা পরিচালক:মীর মোশাররফ হোসেন।
